--- বিজ্ঞাপন ---

দেখে এলাম স্পর্শানুভূতির প্রাসাদ : আল্ হামরা

0

সৈয়দ মুহম্মদ জুলকরনাইন♦
অলিম্পিক সিটি ‘বার্সিলোনা’র পর স্পেনের দ্বিতীয় নগরী গণ্য করা হয় ‘সেভিলা’কে। সেভিলা বর্তমান স্বায়ত্বশাসিত আন্দালুসিয়ার রাজধানী। মনোরম, পরিপাটি ও ঐতিহাসিক এ শহরটি নানাভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। অনেক স্থানে এখনো মুরদের নিদর্শন চোখে পড়ে। মুসলিম স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে সেভিলায় অসংখ্য নতুন ভবন গড়ে উঠেছে এবং এখনো বহু স্থাপনা নির্মাণাধীন। San Juan De Vibera Road 2 তে অবস্থিত Hotel Melia Comfort Macarena পূর্ব থেকে আমাদের জন্য ঠিক করা ছিল। রাত নয় টায় হোটেলের রেস্টুরেন্টে ডিনারের সময় অনেক আলাপ হল। সফরের সময় চাচাতো বোন (সাবেক মুখ্য সচিব মুহাম্মদ আব্দুল করিমের কন্যা) তানিয়া, রিমা, তাসনীমের সাথে কথাবার্তা কম হলেও রাতে ডিনার টেবিলে সকলে অক্লান্ত, উদ্যমী ও মনোযোগী ছিলাম। উন্নত বিশ্ব তথা ইউরোপ এবং তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কে আলোচনার এক পর্যায়ে নিজের দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ হয়। শব্দ, বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে আলোচনা হয়। এগুলোর প্রতিকারে সচেতনতার কথাই উঠে আসে। সার্বিক উন্নয়ন সাধনে সত্য, সাম্য ও সংহতির বিষয়েও আলোচনা হয়। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা আনয়নে ও নিরাপদে বসবাসের জন্য আল্লাহ পাকের সাহায্য কামনা করা হয়।
সেভিলা শহরের Alcazer দূর্গ অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও দর্শনীয় স্থান। Santa Maria গির্জাটি এক সময় বিখ্যাত মসজিদ ছিল। ১২৪৮ সালের পর এটিসহ বহু মসজিদকে গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়। উমাইয়া শাসনামলের রাজধানীর কোন স্থানে বর্তমানে কোন মসজিদ নেই।
১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর গ্রানাডা নগরে পৌঁছি বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে। নগরটি কার হাতে প্রতিষ্ঠিত তাতে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে এটি Daughter of Noah’s অর্থাৎ নবী নূহ (আ.)এর কন্যার হাতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । অন্যান্য ঐতিহাসিকদের ধারণা, গ্রীক দেবতা Hercules কন্যা ‘Granata’ গ্রানাডার গোড়াপত্তন করেন। কেউ বলেছেন আরবী শব্দ গামামা হতে গ্রানাডার নামকরণ হয়েছে। মুসলিম স্পেনের সৌর্যবীর্যের কেন্দ্র ছিল এ নগরী। পৃথিবী বিখ্যাত প্রাচীন নগরীগুলোর অন্যতম গ্রানাডা ৪টি খালের Canal মিলনস্থলে অবস্থিত। এটিকে মুর সভ্যতার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল Last Post বলা হয়েছে। ৭৮০ বছর শাসনাধীন থাকা কালে মুসলমানদের হাত থেকে গ্রানাডা চলে যায় খ্রিষ্টানদের দখলে। আমাদের এখানে আসা হয়েছে আল্ হামরা প্রাসাদ অবলোকনের জন্য। সবুজ আচ্ছাদিত Qal’ at al-Hamra বা লাল কেল্লা খ্যাত প্রাসাদটি ১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মদীনার খাজরাজ বংশের মুহাম্মদ ইব্নে ইউসুফ ইবনে নাসের নির্মাণ করেন। তিনি মুহাম্মদ আল্ আহমার নামেও পরিচিত ছিলেন। তাই তাঁর নির্মিত প্রাসাদের নামকরণ হয় আল্ হামরা। ২৬০ বছর বনু নাসের বংশ গ্রানাডার শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁদের এ প্রাসাদ দূর্গ হিসেবেও শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নিদর্শন। Al-Hamra নগীর দক্ষিণ পূর্বে Assabica পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এটি দেখার জন্য প্রতিদিন ২০ হাজার দর্শনার্থী সুযোগ পায়। প্রাসাদ অভ্যন্তর ঘুরে দেখতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লাগে। শীত মৌসুমে বিকেল চারটার পর ভেতরের আলো কম থাকে বিধায় দুপুর ১২টার পর পর্যটকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। ভেতরে কক্ষসমূহের পার্থক্য রয়েছে। রাজন্যবর্গ, বিদেশী দূত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্য সাক্ষাৎকার কক্ষগুলো অতিমূল্যবান সামগ্রীর তৈরি। কক্ষ অভ্যন্তরে শিল্পমন্ডিত কারুকাজ। আলোছায়ার স্বপ্নিল পরিবেশ। স্বেত পাথরে তৈরী আল-হামরার দেয়াল এবং খিলানে পবিত্র কুরআনের আয়াত ক্যালিগ্রাফী, প্রাসাদকে অসাধারণ করে তোলেছে। UNESCO কর্তৃক ঘোষিত World Heritage আল্ হামরা, কত গান আর কবিতার আধার বিশ্বের কবি-সাহিত্যিকরাই তা জানেন। মুর কবিদের ভাষায় এটিকে ‘পান্নায় খচিত মুক্তা’ বলা হয়েছে। তার যথেষ্ট যৌক্তিকতাও আছে। মহিমান্বিত প্রাসাদটির সদর বাগান যেমন সুবিন্যস্ত, সুপরিকল্পত ও সুশোভিত, তেমন সামনের ফোয়ারাটির নান্দনিকতাও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শোভনীয় লতা ও রকমারি ফুলগাছ, কমলা, খুবানী Apricot এর ভারে নুয়ে পড়া ফলদ গাছপালা আর ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ব্রিটিশ দেবদারু গাছ, মৌ মৌ গন্ধে ভরা গোলাপ যতই দেখি মন চায় আরো দেখতে। সফরের শেষ গন্তব্যে শেষ দেখাটা দেখছি। সফরের উদ্যোগক্তা ও আমাদের অভিভাবক শ্রদ্ধেয় চাচা মুহাম্মদ আব্দুল করিম (প্রাক্তন মুখ্য সচিব) জানালেন, মুসলিম লিপিবিদ্যা Calligraphy, কারুকার্য ও নির্মাণশৈলীর সাথে পাশ্চত্য রঙতুলির অপূর্ব ছোঁয়ায় আল্ হামরা সত্যিই Paradise on Earth. আমিও একমত পোষণ করে বললাম, এটি নিঃসন্দেহে ভূবনমোহিনী।
এ সফরে আমার সুপ্ত অনুভূতি জাগ্রত হয়। বারে বারে ফিরে গিয়েছি রাসূলে পাক্ (দ.) যামানায়। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থার কথাও স্মরণ হয়। অতঃপর খুলাফায়ে রাশিদীন শাসনামল (৬৩২-৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)। এরপর উমাইয়া খেলাফত চলাকালে আল্ ওয়ালিদ যখন দামেস্ক মসনদে তখন মুসলমানরা স্পেন জয় করেন। যার ফল ছিল সুদূর প্রসারি। ইসলাম আবির্ভাবে জাহিলিয়্যাহ যুগের অবসান ঘটে। কিন্তু অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয় মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের ফলে। ঐতিহাসিক ড্রপারের ভাষায় ‘অপরিচ্ছন্ন শরীর আর কুসংস্কারচ্ছন্ন মন নিয়ে ইউরোপীয়রা তখনো বর্বর বুনো অবস্থা থেকে উঠে আসতে পারেনি। দেয়ালে মাদুর মেঝেতে নল-খাগড়া থাকলেই ধনী বলা হত। তাদের জীবন এতটাই মানবেতর ছিল, তরিতরকারি, গাছের ছালমূলও খাওয়া থেকে বাদ যায়নি।’ এমন অবস্থায় মুসলমানরা স্পেনে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম দ্বারা নবজাগরণ সৃষ্টি করে। রেনেসাঁর সূচনা হয় ইউরোপব্যাপী। তখন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দুষ্পাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করে কর্ডোভায় স্থাপন করা হয় বিশ্ব বিখ্যাত পাঠাগার। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে সৃষ্টি হয় যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ, রসায়নবিদ ইত্যাদি। আমাদেরকে চিরঋণী করে গেছেন আল্ কালী, আল্ যুবায়দী, দার্শনিক ইব্নে রুশ্দ, ইব্নে যুবায়ের, ওবায়দ আল্ বাক্রী, আল্ ইদ্রীসী, আধুনিক রসায়ন শাস্ত্রের জনক যাবের বিন হাইয়ান প্রমুখ। মুসলমানরাই ইউরোপে সর্বপ্রথম মানমন্দির নির্মাণ করেন এবং স্পেনের জেভিটা নগরীতে কাগজ উৎপাদন করে ইউরোপে জ্ঞান চর্চার পথ সুগম করেছেন। যে ইউরোপে এক সময় গোসল করা পাপ ছিল, সে ইউরোপ আজ প্রশংসার দাবিদার। তাদের পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতার জন্য তারা উন্নত। তাদের দেশ পরিচ্ছন্ন, সুবিন্যস্ত ও মনোরম।

লেখক : রাজনীতিক প্রাবন্ধিক

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.