--- বিজ্ঞাপন ---

দুবাইগামী বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা, কমান্ডো অভিযানে ছিনতাইকারী নিহত

0

নিউজ ডেস্ক: প্রায় তিন ঘণ্টার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর মাত্র আট মিনিটের কমান্ডো অভিযানে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ছিনতাই চেষ্টার অবসান ঘটেছে। অভিযানে নিহত হয়েছেন ছিনতাইকারী। নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪৬ জন যাত্রী ও ক্রুকে। তবে সাগর নামে এক কেবিন ক্রু বিমান থেকে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে দুবাইর পথে নতুন যাত্রা শুরু করে এই ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং-৭৩৭ ‘ময়ূরপঙ্খী’। প্রধানমন্ত্রী এবং নিজের স্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য ছিনতাইকারী বিমানটি ছিনতাই করে ক্রুদের জিম্মি করেছিল। মাহাদি নামের এই ছিনতাইকারীর ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। গতকাল এ ঘটনায় পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট উঠা-নামা শুরু হয়। যৌথবাহিনীর অপারেশনের পর চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ বিমান, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অভিযানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৭ ফ্লাইট হিসেবে ১৬২ আসনের ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজটি গতকাল বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইর পথে যাত্রা করে। উড়োজাহাজটি গতকাল সকালে বিশেষ ফ্লাইট হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সফরসঙ্গীদের চট্টগ্রামে এনেছিল। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর নতুন করে ফ্লাইটটি দুবাইর পথে যাত্রা করে। ওই বিমানে ১৩৪ জন যাত্রী ছিলেন, যার মধ্যে বিজনেস ক্লাসের যাত্রী ছিলেন ৯ জন। মোট যাত্রীর মধ্যে ৫৮ জন অভ্যন্তরীণ রুটের (চট্টগ্রামের) এবং বাকি ৭৬ জন দুবাইর। চট্টগ্রামে ৫৮ জন যাত্রী নামিয়ে দিয়ে এখান থেকে ৬৮ জন ইকোনমি ক্লাসের এবং ২ জন বিজনেস ক্লাসের যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটির দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইটে পাইলট, কো পাইলট এবং কেবিন ক্রু মিলে মোট ১৪ জন ছিলেন।
বিমানের একাধিক যাত্রী এবং ক্রুদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যাত্রা করার কিছুক্ষণ পর ফ্লাইটটি ১৫ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে চট্টগ্রামের দিকে আসছিল। এ সময় আচমকা বিমানের মাঝামাঝি সিটের এক যাত্রী ককপিটের দিকে দৌঁড়ে যান। ২৫/২৬ বছরের ওই যুবক বিমানটি ছিনতাই করেছে বলে উল্লেখ করে এক ক্রুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। তিনি নিজের হাতে থাকা পিস্তল সদৃশ একটি জিনিস দেখিয়ে সাথে বোমা থাকার কথা জানান এবং ককপিট খোলার চাপ দেন। না খুললে বোমাটি বিস্ফোরণের হুমকি দেন।
বিষয়টি আঁচ করতে পেরে কেবিনে থাকা অন্য ক্রুরা বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে ব্যাপারটি পাইলট মোহাম্মদ শফি এবং কো-পাইলট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে জানিয়ে দেন। বিমানটি তখন ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করছিল। ৫টা ৩১ মিনিটে পাইলট চট্টগ্রাম কন্ট্রোল টাওয়ারকে ঘটনা জানিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের অনুমতি চান। ওই সময় কো পাইলট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভেতর থেকে ককপিটের দরজা বন্ধ করে দেন।
তবে ফ্লাইটের যাত্রী পেকুয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, ‘উক্ত যুবক কেবিন ক্রুকে ধাক্কা দিয়ে ককপিটের ভিতরে ঢুকে যান। ওই সময় তিনটি আওয়াজ শুনতে পাই। বিমানটি ওই সময় ৬/৭ বার বিপজ্জনক ভাবে উঠা-নামা করে। মনে হচ্ছিল বিমানটি পড়ে যাবে।’
প্রবাসী ওসমান গনি আরো জানান, তিনি ওমান থেকে গতকাল দুপুরে ঢাকায় আসেন। সেখান থেকে বিকেলে ওই ফ্লাইটে চট্টগ্রামে আসতে গিয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, ককপিট থেকে এক পর্যায়ে যুবকটি বেরিয়ে আসেন এবং যাত্রীদের যে যেখানে আছে সেখানে চুপচাপ বসে থাকতে বলেন। যুবকটি একটির পর একটি সিগারেট খেয়ে পুরো কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলছিলেন বলেও জানান ওসমান গনি।
এসময় কেবিনের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ওসমান গনি জানান, ‘এক ভয়াবহ অবস্থা। যাত্রীরা কাঁদছিলেন। শুধু দোয়া-দরূদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমরা নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ছিনতাইকারী গুলি না ছুঁড়লেও বিমানটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেবে বা বিমানটি দুর্ঘটনার মুখে পড়বে এমন আশংকা আমাদের মধ্যে বিরাজ করছিল। পাইলট কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন বা আমাদের ভবিষ্যত কী হবে তা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। শুধু ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আমরা এক ভয়াবহ বিপদের মাঝে আছি সেটিই বুঝতে পারছিলাম।’ এভাবে ১৫/১৬ মিনিট যাওয়ার পর বিমানটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনেকটা ঝাঁকুনি দিয়ে অবতরণ করে বলে মন্তব্য করেন ওসমান গনি।
তিনি বলেন, বিমানটি অবতরণ করার সময় স্বাভাবিক অবস্থা ছিল না। কোনো চলন্ত বাসে কড়া ব্রেক কষলে যেমন হয় তেমন করে বিমানটি অবতরণ করে দাঁড়িয়ে যায়।
চট্টগ্রামের বিমান বাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির কমান্ডিং অফিসার এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিমান হাইজ্যাকের চেষ্টার খবরটি আমাদেরকে জানানো হলে আমরা বিমানবন্দরে এসে অবস্থান নিই। বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করে। ফ্লাইট অবতরণের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, র‌্যাব, নৌবাহিনী, সোয়াত, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা বিমানটি ঘিরে ফেলেন। এ সময় তিনি নিজে মাহাদি পরিচয় দানকারী ছিনতাইকারীর সাথে ক্রমাগত ফোনে কথা বলতে থাকেন। ছিনতাইকারী প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলতে চান। তিনি তার স্ত্রীর সাথেও কথা বলতে চান। এসময় এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান ছিনতাইকারীকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এছাড়া বিভিন্ন কথা বলে তিনি ছিনতাইকারীকে ব্যস্ত রাখেন। ছিনতাইকারী যখন এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমানের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত তখন বিমানবাহিনীর ক্রেন ব্যবহার করে যৌথবাহিনীর সদস্যরা উড়োজাহাজের ভিতর থেকে ক্রুদের নামিয়ে নিয়ে আনেন। অবতরণের পরপরই বিমানের সবগুলো জরুরি দরজা খুলে দেয়া হয়। এয়ারপোর্টের সিঁড়িও লাগানো হয়। এসময় যাত্রীদের কেউ জরুরি পথ বা কেউ সিঁড়ি ব্যবহার করে নেমে আসেন। উড়োজাহাজের ভিতরে শুধুমাত্র ছিনতাইকারী একা অবস্থান করতে থাকেন।
অভিযান সফলভাবে শেষ করার ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান প্রেস ব্রিফিং এ জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ইউনিট বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিএনএস ঈসা খাঁ ঘাঁটিতে আগে থেকে অবস্থান করছিল। খবর পেয়ে দ্রুত তারা বিমানবন্দরে আসেন এবং মাত্র আট মিনিটের মধ্যে অপারেশন সফলভাবে শেষ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কমান্ডোরা ছিনতাইকারীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে স্বাভাবিক নিয়মে তা প্রতিহত করা হয়। এতে প্রথমে তিনি আহত এবং পরবর্তীতে মারা যান। তার ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি, তবে খোঁজখবর করা হচ্ছে বলে মেজর জেনারেল মতিউর রহমান জানান। হলি আর্টিজনের অভিযানের নেতৃত্বদানকারী প্যারা কমান্ডো টিমের কমান্ডিং অফিসার লে কর্নেল এম এম ইমরুল হাসান এখানে অভিযানে নেতৃত্ব দেন বলেও জানান তিনি।
ঘটনা তদন্ত করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে উল্লেখ করে মতিউর রহমান জানান, ওই যাত্রীর বোর্ডিং কার্ড রয়েছে। লাগেজ রয়েছে। সবকিছু নিয়ে অনুসন্ধান করা হবে। তবে তিনি কি অভ্যন্তরীণ রুটের নাকি দুবাইর যাত্রী হিসেবে বিমানে উঠেছিলেন তা জানা যায়নি। তার পরিচয় সম্পর্কেও কোনো তথ্য জানতে পারেনি বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমানের প্রেস ব্রিফিং কালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চট্টগ্রামের কমান্ডিং অফিসার রিয়ার এডমিরাল আশরাফসহ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, র‌্যাব এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ গতরাত ১টা নাগাদ বোয়িং ময়ুরপঙ্খী থেকে সব লাগেজ নামায়। কিন্তু কোথাও মাহাদি নামের কারো কোন লাগেজ ট্যাগ খুঁজে পায়নি। ওই বিমানের ১৩৪ জন যাত্রীর মধ্যে মাহাদি নামে কোন বোডিং কার্ড ইস্যু হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে বিমান ছিনতাইর চেষ্টাকারী যুবক নিজের আসল নাম গোপন করে কেবিন ক্রুর কাছে মিথ্যা পরিচয় দেন। তিনি চট্টগ্রামের বিমানবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমানের নিকটও নিজের নাম মাহাদি বলে উল্লেখ করেছিলেন। অথচ মাহাদি নামে শেষ পর্যন্ত কিছু না পাওয়ায় বিমানটিতে রক্ষিত সব লাগেজই বিশেষ সতর্কতায় তল্লাশি করা হচ্ছে।

৪২ বছর পর : ৪২ বছর পর বাংলাদেশের মানুষ কোন বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রত্যক্ষ করলো। এর আগে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। জাপান রেড আর্মি নামের একটি সংগঠন ফ্লাইট ৪৭২ এর ডিসি ৮ বিমানটিতে ১৪ জন ক্রু এবং ১৩৭ জন যাত্রীসহ মোট ১৫১ জন আরোহী ছিলেন। প্যারিস থেকে যাত্রী নিয়ে ভারত হয়ে ব্যাংকক যাওয়ার পথে তৎকালীন বোম্বাইয়ের আকাশে এটি ছিনতাই করার ঘোষণা দেয় ছিনতাইকারীরা। পরবর্তীতে বিমানটিকে ঢাকার তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়েছিল। এখান থেকে কুয়েত, সিরিয়া হয়ে আলজেরিয়ায় গিয়ে টানা এক সপ্তাহের জিম্মি নাটকের অবসান হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৫ অক্টোবর অবসান হওয়া ওই বিমান ছিনতাই ঘটনার পর দেশের মানুষ আর এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হননি। বহুদিন পর গতকাল বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.