--- বিজ্ঞাপন ---

কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তান পরমাণু যুদ্ধের মুখোমুখি ভয়াবহতার আশংকায় বিশ্ব নেতাদের তোড়জোড় পর্ব-১

0

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম: এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তির দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীঘদিনের বিরোধপূর্ণ অঞ্চল কাশ্মীরকে ঘিরে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ভারত সরকার কর্তৃক গত ৫ আগস্ট কাশ্মীরের উপর থেকে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে ৩৭০ ধারা বিলোপ ঘোষণা করে কার্ফু জারি সর্বশেষ উত্তেজনার কারণ। এর কয়েক মাস আগে ফেব্রুয়ারীতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় বিমান হামলা ও পরবর্তীতে ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করে বৈমানিক আটক পরে মুক্তি । এবং সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট কাশ্মীরকে ভারতের  বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার ৩৭০ ধারা বিলোপ করে কার্ফু দিয়ে গোটা অঞ্চলের মানুষকে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়ার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের  ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ কাশ্মীরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কাশ্মীরের ঘটনায় বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র কতটা উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার বার মধ্যস্থতা প্রস্তাব সেটা প্রমাণ করে। সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরাণ খান কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পরমাণু যুদ্ধে গড়াতে পারে ইঙ্গিত দেন।  ভারত ওই ভাষণকে পরমাণু যুদ্ধেও হুমকি হিসেবে দেখছে। তবে জাতিসংঘে উত্থাপনের পর বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এর ভয়াবহ পরিণতি ভেবে  বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে উঠেছেন।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট মোদী ইমরান উভয়ের সাথে বৈঠকও করেছেন এবং মধ্যস্থতা করতে যে কোন সময় মধ্যস্থতা করতে রাজী বলেছেন।  ভারত এ মধ্যস্থতা মানতে রাজী নন। দেশটির বক্তব্য দুদেশের মধ্যেই এটি আলোচনা হবে সীমলা চুক্তির ভিত্তিতে। তবে দুটি দেশ দীর্ঘ ৫০ বছরেও এর কোন কুল কিনারা করতে না পারায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়াও নরওয়েসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

 

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস গত ২ অক্টোবর সংস্করণে সম্পাদকীয়তে বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশের দাবীদার হয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী সরকার কাশ্মীরে কার্ফু দিয়ে সেখানকার মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করেছেন মর্মে কড়া সমালোচনা করেছে। পত্রিকাটি অবিলম্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে এ ব্যাপারে আরও সোচ্চার হতে বলেছে। মার্কিন সিনেটের ৫০ জন সদস্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কাশ্মীরে কার্ফু প্রত্যাহার করে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার দাবী জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ডেমোক্রেট দলের সিনেটর ভ্যান হোলেন কাশ্মীরের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে যেতে চাইলে তাকে সেখানে যেতে দেয়নি ভারতীয় প্রশাসন। ভারতের রাজধানী দিল্লীতে সাংবাদিকদের আলাপকালে সিনেটর ভ্যান হোলেন বলেছেন, ভারত সেখানে কাউকে যেতে দিচ্ছেনা কেন, কি লুকাতে চাইছে দেশটি। মার্কিন সিনেটে ইতিমধ্যেই গত মাসে কাশ্মীর ডেমোক্রেট সিনেটররা কাশ্মীরের মানুষদের উপর কার্ফুসহ মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে ভারতকে চাপ দেয়ার জন্য নতুন একটি বিল উত্থাপন করেছে যা সিনেটে ভোটাভুটিতে যাবে। ভারতে কাশ্মীর  পর উভয় দেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ও যুদ্ধ জড়ো করছে। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর প্রায়

প্রতিদিনই বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সৈন্য মারা যাচ্ছে। যেকোন মুহুর্তে সীমিত কিংবা বড় আকারের যুদ্ধ বেধে যেতে পারে আশংকা করা হচ্ছে।

 

 

কাশ্মীরের গোড়ার কথা

মোগল আমলে একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যর জন্য  মুসলিম অধ্যুষিত এই কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলা হত। বিরোধপূর্ণ অঞ্চল কাশ্মীরের একাংশ আজাদ কাশ্মীর ও উত্তরাঞ্চল গিলগিট বালটিস্তান ৮৫,৮৪৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। অপরাংশ জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নিয়ে ১,০১,৩৩৮ বর্গ কিলোমিটার ভারতের অধীনে শাসিত। ভারত অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান কাশ্মীরের ট্রান্স কারাকোরাম অংশ চীনকে ১৯৬৩ সালে হস্তান্তর করে দেয় ১৯৬৩ সালে এবং আকশাই চিন অঞ্চলসহ মোট ৩৭,৫৫৫ কিলোমিটার এলাকার উপর থেকে নিজেদের দাবী প্রত্যাহার করে চীনকে ছেড়ে দিয়েছে। ভারত ঐ অঞ্চল নিজেদের বলে দাবী করে আসছে। কাশ্মীরের ভারত অংশের  জনসংখ্যা ১ কোটি ৪৫ লক্ষের কাছাকাছি। জনসংখ্যার  বেশীর ভাগই মুসলিম। পাকিস্তান অংশের আজাদ কাশ্মীরের জনসংখ্যা ৪০ লক্ষ এবং গিলগিট বালটিস্তান ২০ লাখ। ১৯৪৭ সালের আগস্টে  বৃটেন থেকে  ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের সময় কাশ্মীর নিয়ে দুদেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে। জনসংখ্যার বেশীর ভাগ মুসলিম পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইলে রাজ্যটির হিন্দু মহারাজা  হরি সিং ভারতে যোগ দেয়ার পক্ষে মত দিলে পাকিস্তান তা মানতে অস্বীকার করে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্নীরে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পাকিস্তান আজাদ কাশ্নীর অঞ্চল দখল করে নেয়। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রথমবারের যুদ্ধবিরতি হয় এসময় জাতিসংঘের পক্ষ থেকে গণভোটের মাধ্যমে এ বিরোধ সমাধানের সুপারিশ করা হলেও অদ্যাবদি তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ১৯৬৫ সালে পুনরায় এই কাশ্নীর নিয়ে দেশ দু’টি আবারও যুদ্ধে লিপ্ত হয়।  সেই  থেকেই দেশ দুটি’র মধ্যেকার বিরোধ চলে আসছে।

 

ভারত কর্তৃক ৩৭০ ধারা বিলোপ সর্বশেষ উত্তেজনার কারণ

বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির নয়াদিল্লীর সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষ ঐদিন ৫ আগস্ট (২০১৯) বাংলা বিভাগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে শিরোনাম দিয়েছেন “মুসলিম-প্রধান কাশ্মীরের চরিত্র বদলানোই মূল লক্ষ্য?”

বিবিসি বলেছে, মুসলিম-গরিষ্ঠ কাশ্মীরের ‘ডেমোগ্রাফি’ বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেওয়াই সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের পেছনে আসল উদ্দেশ্য কি না, তা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্ক দানা বাঁধছে। ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি বা তাদের পুরনো অবতার জনসংঘ অবশ্য বহু বছর ধরেই ভারতীয় সংবিধানের এই বিতর্কিত ধারাটি বিলোপ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। বিজেপির বক্তব্য ছিল, কাশ্মীর যাতে সম্পূর্ণভাবে ভারতের সাথে সংযুক্ত বা ‘আত্মীকৃত’ হতে পারে সে জন্যই এই ধারাটি বিলোপ করা দরকার।

রাজ্যসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদ তৃণমূল-সহ অন্য কিছু বিরোধী দলকে পাশে নিয়ে ঘোষণা করেন, “ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীরের যে অনন্য চরিত্র, কলমের এক খোঁচায় বিজেপি সেটাই বরবাদ করে দিতে চাইছে।”

কংগ্রেস নেতা ও ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী  গুলাম নবি আজাদ বলেন, “এমন একটি রাজ্যকে যদি কেউ এক সূত্রে বেঁধে রাখতে পারে, সেটা ছিল সংবিধানের ৩৭০ ধারা। এই ধারায় রাজ্যের সব ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষের জন্যই বিশেষ ব্যবস্থা ছিল – যা আজ বিজেপি শেষ করে দিল।” “এই রাজ্যের লাদাখে বৌদ্ধ ও মুসলিমরা থাকেন, কাশ্মীরে থাকেন মুসলিম, পন্ডিত ও শিখরা। আর জম্মুতে জনসংখ্যার ষাট শতাংশ হিন্দু, আর বাকি চল্লিশ শতাংশ মুসলিম।”

 

প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক : কাশ্মীরে ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতি অনুসরণ করতে চলেছে ভারত

ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সামরিক সম্পর্ক অনেক দৃঢ়-তা সবার জানা। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে বিজেপি সরকার আসার পর ভারত হয়েছে ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজার। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়- গত কয়েক বছরে দেশ দুটির অস্ত্র বাণিজ্য ছয় বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংঘাতে বড় ভূমিকা রাখছে ইসরাইল’ শিরোনামে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি মতামত লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক (স্টার অনলাইন, ১ মার্চ, ২০১৯)। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহের ওপর বিশ্লেষণ লিখে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। তবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাম্প্রতিক পাকিস্তান অভিযান তার দৃষ্টি এড়ায়নি। এক বিশ্লেষণে তিনি তুলে ধরেছেন  প্রায় ২,৫০০ মাইল দূরে থেকে তেলআবিব কীভাবে সহযোগিতা করছে নতুন দিল্লিকে।

তবে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের এই সখ্যতার বিষয়ে অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন বলেও মন্তব্য রবার্ট ফিস্কের। ব্রাসেলসের এক গবেষক শৈরি মালহোত্রা ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেতজ-এ প্রতিবেদনে গত বছর লিখেছেন, “ভারত-ইসরাইলের (সুদৃঢ় সামরিক) সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে বিজেপি এবং লিকুদ পার্টিও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে।”

সেই গবেষকের মতে, ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের বিশেষ করে মুসলমানদের হত্যা করছে তা দেখে অনুপ্রাণিত ভারতের ‘ইন্টারনেট হিন্দুরা’। ইন্টারনেট ব্যবহার করে যারা সেই খবর নিয়মিত রাখছেন তারাই মূলত ইসরাইলের ব্যাপক ভক্ত। তারাও যেনো চান সেই একই কায়দায় পাকিস্তানকে ঘায়েল করা হোক।” (চলবে)

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.