--- বিজ্ঞাপন ---

কতটা শক্তিশালী ইরান

0

আমেরিকা ইরান এখন যুদ্ধের মুখোমুখি। যদিও ইরানের পক্ষে সরাসরি আমেরিকাতে আঘাত হানা কঠিন কাজ তারপরও ইরানের টার্গেট যুদ্ধ যদি শুরু হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইরানের ঘাটিগুলো ধংস করবে। এর ফলে মূলত যেটি হবে মুসলিম দেশগুলো একে অন্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। মাঝখানে লাভ হবে আমেরিকার। বাড়বে অস্ত্র বিক্রি। এরই মধ্যে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাটির প্রায় একশ সৈন্য নিহত হয়েছে। এ হামলার প্রতিশোধ আমেরিকা কিভাবে নেবে তা এখন দেখার বিষয়। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, কিসের উপর ভিত্তি করে ইরান লড়াই শুরু করবে? ইরানের ইতিহাসটাই কি?

ইরান পৃথিবীর প্রাচীনতম কাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত অস্তিত্বশীল বৃহৎ সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত এ দেশটি ইসলামের শিয়া মতাবলম্বীদের কেন্দ্র। ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার আছে। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বর্তমান ইরান ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য পারস্যের কেন্দ্র। ইরান ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সম্পর্কিত অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। এর উত্তরে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কাস্পিয়ান সাগর ও তুর্কমেনিস্তান, পূর্বে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান; দক্ষিণে ওমান উপসাগর, হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগর, এবং পশ্চিমে ইরাক ও তুরস্ক। তেহরান ইরানের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। শহরটি ইরানের উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত। ইরান ৩০টি প্রদেশে বিভক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ।

ইরানের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। একসময় আমেরিকার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর থাকা ইরান এখন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। সংক্ষেপে এসব ঘটনা তুলে ধরছি, ১৯২৫ সালে পাহলাভি সাম্রাজ্য দেশটির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দ্রুততার সঙ্গে আধুনিক ইরানি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। সেনা কর্মকর্তাদের ইউরোপ এবং আমেরিকার সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সর্বাধিক অস্ত্র আসত মিত্র রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ১৯৪১ সালে ইরানি সামরিক বাহিনী ব্রিটিশ-সোভিয়েত আক্রমণ প্রতিহত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ওমানের সুলতানের পক্ষাবলম্বন করে। বিপ্লব-পূর্ববর্তী সময়ে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল ইরানের।

ইরানী বিপ্লব হচ্ছে ১৯৭৯ সালে ঘটা একটি যুগান্তকারী বিপ্লব যেটা ইরানকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলাভীর একনায়কতন্ত্র থেকে আয়াতুল্লাহ খামেনেইর ইসলামিক গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত করে। একে বলা হয় ফরাসি এবং বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব। ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী আর প্রভাবশালী শাহী রক্তের ধারক ছিলেন তিনি। তার বংশ গত আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। সেই বংশের শেষ সম্রাট ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বিপ্লবী দেশবাসীর কাছে পরাজিত হয়ে মিশর পলায়ন করে। কিছু দশক আগে রেজা শাহ পাহলবী ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান। সর্বময় ক্ষমতা ছিলো পার্লামেন্টের হাতে এবং নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সেই ক্ষমতা ভোগ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই ইরানে ব্যাপক আকারে তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় যার মালিক ছিলো ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো। ঠিক এই সময়টিতে মোসাদ্দেক নামক জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক নেতা দেশের সব তেল সম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ব্রিটেনে তখন উইনস্টন চার্চিল ক্ষমতায় আর যুক্তরাষ্ট্রে হেনরি ট্রুম্যান। মোসাদ্দেকের জয় লাভের ফলে দুই ক্ষমতাশালীর মাথায় বাজ পড়লো। শুরু হলো মুসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার নীল নকশা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ‘এসআইএস’- লন্ডনে বসে যৌথ পরিকল্পনা করলো। প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্টের নাতি কার্মিট রুজভেল্ট তখন সিআইএ প্রধান। তিনি উড়ে এলেন লন্ডনে। প্রণীত হলো অপারেশন ‘এ্যাজাক্স’ এর নীল নকশা। পরিকল্পনা মতে ইরানী সেনাবাহিনীতে ঘটানো হলো অভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ মুসাদ্দেক পদচ্যুত হলেন। তার স্থানে আজ্ঞাবহ জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদীকে নিয়োগ দেয়া হলো। কিন্তু মূল ক্ষমতা রাখা হলো ইঙ্গো মার্কিন সাম্রাজ্যের অনুগত শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর নিকট।

এই ঘটনার একদিনের মাথায় সেনাবাহিনীতে একটি কাউন্টার অভ্যুত্থান হলো। অভ্যুত্থানকারীরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে উদ্ধার করলেন। অন্যদিকে শাহ পালিয়ে গেল বাগদাদে এবং তারপর ইতালিতে। কিন্তু এর দুই দিন পর আরো একটি রক্তাক্ত পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটানো হয় সেনাবাহিনীতে। ফলে মার্কিন-বৃটেনের নীল নকশা অপারেশন এ্যাজাক্স সফল হয় শতভাগ। শাহ ইরানে ফিরে আসে চটজলদি। এসব ঘটনা ঘটেছিল ১৯৫৩ সালে। পতনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ১৬ ই জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের নিরঙ্কুশ সর্বময় ক্ষমতা ছিলো শাহের হাতে। তার ইঙ্গো-মার্কিন মদদদাতারা অনবরত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন তাকে। ফলে তার পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিদিন রাজপথে শত শত মানুষকে গুলি করে মারছিলো। অথচ ১৯৫৩ সালের পর থেকে ইরানে যে অকল্পনীয় উন্নতি হয়েছিলো তাতে জনগণের খুশি বা সন্তুষ্ট থাকার কথা ছিলো এবং তারা তা ছিলো না। শাহের কতিপয় ব্যক্তিগত আচরণ, অভ্যাস আর পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ প্রচলন দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধীরে ধীরে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। এই বিক্ষোভই অগ্নিগর্ভে রূপ নেয় ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে। তেহরান শহরে কোন পাবলিক বাসে কোন ধর্মীয় লেবাসধারী মানুষ উঠলেই কনন্ডাক্টর টিটকারী করে বলতো- আমরা আলেম আর বেশ্যাদের বাসে চড়াই না। রাস্তায় রাস্তায় গড়ে উঠেছিল মদের দোকান। শহর ও শহরতলীতে শত শত নাইট ক্লাবে চলতো সারারাত ব্যাপী ডিস্কো পার্টির নামে মদ্যপান, জুয়া আর অবাধ যৌনাচার। শাহ নিজেও ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত। তার স্ত্রী, সন্তানরাও পশ্চিমা ধাঁচে চলতেন। শাহ এবং তার স্ত্রী সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং দেশী বিদেশী সরকারী অনুষ্ঠানসমূহে পশ্চিমাদের পোশাক পড়তেন। এসব কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ দিনকে দিন ফুঁসে উঠতে থাকেন। আয়াতুল্লাহ খামেনেইর ছিলেন একজন অপরিচিত ধর্মীয় ইমাম। মুসলমানদের এই মনের কষ্ট তিনি বুঝতে পেরে শিয়াদের ধর্মীয় শহর নাজাফে একটি জনসভা আহবান করেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয় সেখানে। শাহের সরকার প্রথমে এই বিশাল সমাবেশকে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকলো দ্রুত। তেহরানের রাস্তায় বিক্ষুদ্ধ মুসলমানেরা নেমে আসলো। সংখ্যায় ছিলো তারা অগণিত। সেদিন ছিলো শুক্রবার। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ লোক তেহরানে জমায়েত হয়। তারিখটি ছিলো ১৯৭৮ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর। শাহের বাহিনী বিশাল জনসমাবেশের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। আপাতত লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় কিন্তু দিবসটিকে ইরানের ইতিহাসে কুখ্যাত ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ব্ল্যাক ফ্রাইডের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত সিআইএ এজেন্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে সিআইএ হেড কোয়ার্টারে রিপোর্ট করেন যে- ৮ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর শাহের শাসন ক্ষমতা এতোটাই সুদৃঢ় হয়েছে যে- আগামি ১০ বছরে বিরোধী পক্ষ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অথচ এর মাত্র ৩ মাসের কিছু সময় পর অর্থাৎ ১৬ ই জানুয়ারি ১৯৭৯ সালে মাত্র একদিনের গণ-অভ্যুত্থানে শাহের পতন হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে শাহ দেশ থেকে পালিয়ে যান। তার দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। তিনি প্রথমে ইটালি যান। কিন্তু ইতালি তাকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় করে দেয়। এরপর তার বিমান উড়াল দিলো পানামায়। সেখানকার সরকারও গ্রহণ করলো না। অনেক দেন দরবার এবং অনুনয় বিনয় করার পর মিশর তাকে সাময়িকভাবে সেই দেশে ঢোকার অনুমতি দিয়েছিলো একটি কারণে, প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে বোঝানো হলো যে- শাহের প্রথম স্ত্রী ফৌজিয়া ছিলেন মিশরের প্রয়াত এবং ক্ষমতাচ্যুত বাদশা ফারুকের বোন। এই রাজপরিবারের প্রতি তখনো মিশরের জনগণের বেশ সহানুভুতি অবশিষ্ট ছিলো। কাজেই মিশরের রাজকন্যার স্বামী ভিক্ষুকের মতো দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে সেটা মিশরবাসীর জন্য হয়তো অস্বস্তিকর হয়েছিল। শাহ ফিরে এলেন কায়রোতে। ইতিমধ্যে তার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। ফলে কায়রোর একটি হোটেলে তিনি মারা যান ১৯৮০ সালের ২৭ শে জুলাই, যখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬০ বছর। ক্ষমতার শেষ দিকে সম্রাট অতিমাত্রায় অহংকারী হয়ে পড়েছিল। নিজের বংশ আর রাজরক্তের অহমিকায় তিনি লোকজনকে মানুষ বলেই মনে করতেন না। কথায় কথায় লোকজনকে অসম্মান করতন। দেশের সেনাবাহিনী বা বেসামরিক প্রশাসনের বড় বড় কর্মকর্তাগণের পরিবর্তে তিনি মার্কিন এবং বৃটিশ দূতাবাসের কুকুরকে বেশি মর্যাদা দিতেন। এভাবেই শাহ্ এর অধ্যায় শেষ হয়।
এদিকে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নেয়। মার্কিন অবরোধের জন্য ইরান নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা শুরু করে। ১৯৮০-র দশকে দেশটিকে প্রতিবেশী ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। ১৯৮৯ সালে ইরান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অস্ত্র আমদানি করে সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন শুরু করে। মার্কিন-ইসরায়েলের শত বাধার পরও দেশটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্ত সামরিক শক্তি। উইকিপিডিয়ায় পাওয়া তথ্য মতে, ড্রোন প্রযুক্তির অধিকারী শীর্ষ পাঁচটি দেশের অন্যতম ইরান। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে পর্বতময় দেশগুলোর একটি। ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার আছে। ইরান প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত অস্তিত্বশীল বৃহৎ সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

দেশটির মোট আয়তন ১৬,৪৮,০০০ বর্গকিলোমিটার। ইরানের নিয়মিত সেনা সদস্য ৫,২৩,০০০ জন, রিজার্ভ আর্মি ৩,৫০,০০০ জন এবং আধা-সামরিক বাহিনীতে রয়েছে ১৫,১০,০০০ জন সদস্য। সেনাবাহিনী, স্থলবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং আইআপজিসি নিয়ে ইরানি সামরিক বাহিনী গঠিত। দেশটির সামরিক বাজেট ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট শাহ সরকারের পতনের পর থেকেই মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। বিপ্লব ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা ইরান সরকারের উপর ইরাককে দিয়ে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, তাতেও লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি। ইরাক ও ইরানের মধ্যে ৮ বছর স্থায়ী ঐ যুদ্ধ থেকে ইরান প্রতিরক্ষার এক অসামান্য অভিজ্ঞতা অর্জন করে। তেহরানের বিপ্লবী সরকারকে গোড়াতেই থামিয়ে দেয়ার মার্কিন পরিকল্পনা আজ ইরানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। সামরিক ক্ষেত্রে ইরানের গত ২৭ বছরের অর্জন, দেশটির বিরুদ্ধে হুট করে কিছু করে বসার খামখেয়ালিপনা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রেখেছে। ইরান বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চাশটিরও বেশি দেশে অস্ত্র রপ্তানি করে বলে সম্প্রতি সেদেশের সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে।
ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরী কিছু সমরাস্ত্রের পরিচিতি তুলে ধরছি। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগ্রামী টর্পেডো বা আন্ডার ওয়াটার মিজাইলের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ‘সাংকেতিক নামের সামরিক মহড়ায় ইরানের নৌবাহিনী ঐ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়। ইরানের নির্মিত এই টর্পেডোর গতি সেকেন্ডে একশ মিটার, যা প্রচলিত টর্পেডোগুলোর চার গুণ। বিশ্বে এ যাবৎ নির্মিত টর্পেডোগুলোর সর্বোচ্চ গতি সেকেন্ডে ২৫মিটার। ইরানের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম দেহক্বানি এই টর্পেডো সম্পর্কে বলেছেন, ইরানের বিজ্ঞানীরা অন্য কোন দেশের সহযোগিতা ছাড়াই বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন আন্ডার ওয়াটার মিজাইল তৈরী করেছে। তিনি বলেছেন, রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম এই টর্পেডোর ছোবল থেকে বিশ্বের অত্যাধুনিক সাবমেরিনও নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। ইরান অত্যাধুনিক টর্পেডো তৈরির ঘোষণা দেয়ার পর পশ্চিমা বিশ্ব বিস্মিত হয়েছে। ইরানও যে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, তা পাশ্চাত্যের ধারনার বাইরে ছিল। ইরানের নৌ বাহিনী এই টর্পেডোর নাম দিয়েছে হুত বা তিমি। তিমির মতো ক্ষিপ্র গতি সম্পন্ন বলেই হয়তো এই নামটি নির্বাচন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে মোতায়েন মার্কিন নৌ বহরগুলোর হুমকি মোকাবেলা করার লক্ষ্যেই ইরান অত্যাধুনিক আন্ডার ওয়াটার মিজাইল তৈরীর কাজে হাত দিয়েছিল।

ফাজর-৩ ক্ষেপণাস্ত্র : রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। এপ্রিলের সামরিক মহড়া চলাকালে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ফাজর (উষা)-৩ ক্ষেপণাস্ত্রেরও সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। বিশ্বের কোন রাডারই ইরানের নির্মিত অত্যাধুনিক ফাইং বোটের উপস্থিতি অাঁচ করতে পারবে না এবং এটি চলন্ত অবস্থায় পানির উপরিভাগ থেকে নিমিষেই শূন্যে উঠে লক্ষ্যবস্ত্ততে আঘাত হানতে পারে। ফাজর (উষা)-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা চল্লিশ কিলোমিটার। ইরানের নৌ বাহিনী সাগরে নিজস্ব প্রযুক্তির স্মার্ট মাইন বসানোর মহড়াও সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে। বিপদের সময় মুহূর্তের মধ্যেই যাতে কৌশলগত হরমুজ প্রণালীকে শক্রুদের জন্য মৃত্যুপুরিতে পরিণত করা যায়- সে লক্ষ্যেই মাইন বসানোর ঐ মহড়া দেয়া হয়েছে। এই সরু জলপথ দিয়েই বিশ্বের ৪০ শতাংশ তেল, জাহাজে করে সরবরাহ করা হয়। ২০০৩ সালে ইরান শাহাব বা উল্কা-৩৩ সাংকেতিক নামের দুই হাজার একশ কিলোমিটার পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটির সফল পরীক্ষা চালায়। ইরানের দূর পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র অনায়াসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের অভ্যন্তরে আঘাত হানতে সক্ষম।

ইরান শাহাব-৩ এর সাহায্যে ইসরাইল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। এছাড়া, ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন সাবমেরিনগুলোও এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। দক্ষিণ ইউরোপেরও কয়েকটি দেশে আঘাত হানতে পারবে এই ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যাপক সংখ্যায় তৈরী করছে বলে মনে করা হয়। কারণ শাহাব-৩ এর সফল পরীক্ষার পর ইরানের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলী শামখানি বলেছিলেন, ব্যাপক সংখ্যায় শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরীর সকল সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা ইরানের রয়েছে। ইরান এরই মধ্যে দশ হাজার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরীর কাজে হাত দিয়েছে বলে সমর বিশারদদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরীতে সফল হলে আমেরিকাও ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রের নাগালের ভেতরে চলে আসবে। ইরান সম্প্রতি অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান তৈরি করেছে। বছরখানেক আগে ইরানের বিমান বাহিনী তাদের নির্মিত প্রথম বোমারু জেট জঙ্গী বিমান প্রদর্শন করে এবং জঙ্গী বিমান নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের কথা ঘোষণা করে। ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরে ‘জুলফিকারের আঘাত’ সাংকেতিক নামের সামরিক মহড়া চলাকালে, ইরানের নির্মিত জঙ্গী বিমানের সফল উড্ডয়ন ঘটানো হয়।

ইরানের নির্মিত জঙ্গী বিমানের নাম দেয়া হয়েছে- স্বায়েকে বা বজ্র। ইরানের বিমান বাহিনী বলেছে, ‘বজ্র’ নামের জঙ্গী বিমানটি পুরোপুরিভাবে ইরানে নির্মিত এবং একজন পাইলট চালিত এই জঙ্গী বিমান আমেরিকার এফ-এইটিন জঙ্গী বিমানের চেয়েও শক্তিশালী। উন্নতমানের রাডার সজ্জিত ইরানের এ জঙ্গী বিমান কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও বোমা বহন এবং নিক্ষেপ করতে সক্ষম। ইরানের বিজ্ঞানীরা প্রথম বারের মতো সাবমেরিন তৈরী করেছে। ইরানের তৈরী তিমি শ্রেণীর সাবমেরিন পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের তুলনামূলক কম গভীর ও লোনা পানিতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে। সাবমেরিনটি তৈরীতে বিদেশী কোন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেয়া হয়নি বলে বার্তা সংস্থা ফার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবমেরিনটি ইরানি বিজ্ঞানীদের ১০ বছরের নিরলস গবেষণার ফসল বলে ইরানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এছাড়া জঙ্গী বিমান নির্মাণে সফলতার কথা ঘোষণার দিনই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দুই হাজার পাউন্ড-গাইডেড বোমা তৈরিরও ঘোষণা দেয়। বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কাছে এ ধরনের স্মার্ট ও গাইডেড বোমা রয়েছে। এছাড়া ‘জুলফিকারের আঘাত’ মহড়ায় ইরানের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী আলাদা আলাদা ভাবে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরী কয়েকশ কিলোমিটার পাল্লার বিভিন্ন মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এখানে আরো উল্লেখ্য ইরানের নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা পাঁচ লক্ষেরও বেশী। আধা সামরিক বাহিনীতেও কয়েক লাখ প্রশিক্ষিত সদস্য রয়েছে। এছাড়া ইরানের ১৫ বছরের বেশী বয়সী সকল পুরুষের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়া বাধ্যতামূলক।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী-ই হচ্ছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।### ৮.১.২০২০

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.