--- বিজ্ঞাপন ---

একজন আবিদা ইসলাম

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

0

ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ###
তিনি শুধু একজন কূটনীতিক নন, একজন শিল্পীও বটে। তিনি গান বাঁধেন ও সেগুলোকে গাঁথেন বিভিন্ন সুরে।
সুরের মুর্ছনা বিমোহিত ও আন্দোলিত করে মানুষকে। সুরের তালে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় মানুষ। সৃষ্টি হয় মানুষে মানুষে বন্ধন। তাই সঙ্গীতের সুর ছাপিয়ে যায় দেশ, মহাদেশ, সীমানা, সংস্কৃতি, ভাষা ও কৃষ্টিকেও। সেই সুরের মুর্ছনা তৈরির কাজটি করে থাকেন শিল্পীরা। যদি এই দায়িত্বটি নিজ কাঁধে নিয়ে নেন কোনও রাষ্ট্রদূত তাহলে বিষয়টি অন্যরকম সুখকর হয়ে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম সেরকমটিই করছেন। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ১৫তম বিসিএস ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ‘ক্যারিয়ার ডিপ্লোমেসির’ বাইরে বাংলাদেশি সংস্কতিকে ভিনদেশি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটাও করছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। তাঁর সুরের মুর্ছনা একদিকে যেমন মোহিত করছে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের অন্যদিকে ধন্য করছে প্রবাসী বাঙালিদেরকে।
শৈশব থেকেই সুর আর স্বরের সঙ্গে সখ্যতা আবিদা ইসলামের। সুরের মায়াজালে আকৃষ্ট হয়ে গানকে জীবনের ধ্যান-জ্ঞান-ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সুরের মুর্ছনায় মানুষকে মোহিত করার পাশাপাশি পেশাদার কূটনীতিকের পরিচয়ে এই জগতে পার করেছেন জীবনের ২৫টি বছর। কূটনীতিকের দায়িত্ব নিয়ে কলকাতা, লন্ডন, কলম্বো ও ব্রাসেলসসহ যেখানেই গেছেন সেখানেই বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক সময়ের তালিকাভুক্ত গুণী এ শিল্পী। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কূটনীতি চালিয়ে গেছেন তিনি সমানতালে। বিদেশে সফলভাবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইমেজটা তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন। শৈশব থেকেই তাঁর শিল্পীসত্তা এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে ‘কূটনীতিক’ আবিদা ইসলামের পাশাপাশি যে কেউ অবলীলায় তাঁকে ডাকতে পারেন ‘শিল্পী’ আবিদা ইসলাম নামেও।
পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে দূতাবাস পরিচালনা করছেন তিনি। আবেগ ও শিল্পীসত্তাকে তো কোনও নিয়মের সীমানায় আটকে রাখা যায় না কিংবা কোনও ফ্রেমে ব্রাকেটবন্দী করা যায় না। তাই কূটনৈতিক জীবনে শত ব্যস্ততার মাঝেও দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করছেন যা প্রবাসীদেরকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা আর সাহস যোগাচ্ছে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন হোক আর রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী, জাতির জনকের জন্মদিন, নারী দিবস ও বসন্ত বরণ হোক সুর যেন এই রাষ্ট্রদূতের নিত্যকার সারথী এবং প্রতিক্ষণের আরাধনা। মোদ্দা কথা, প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাক লাগানো ঘটনার সূচনা করেন রাষ্ট্রদূত নিজেই। প্রতিবারেই একেবারে ভিন্ন আমেজে। এসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পীদের পাশাপাশি নিজেও সুরের মুর্ছনা তৈরি করেন। তাঁর মিষ্টি ও সুরেলা কন্ঠে গান শুনে মোহিত হন উপস্থিত দর্শকরা।
বছর খানেক আগে সিউলে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে ১৪২৬ পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ প্রবাসী বাংলাদেশিরা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নিয়ে রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম দারুণ দোত্যনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি হারমোনিয়ামে সুর তোলার পাশাপাশি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে গেয়ে উঠেন। তাঁর সুরেলা কন্ঠে এ গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যান বিদেশী মিশনের কূটনীতিকবৃন্দ এবং কোরিয়ান অতিথিসহ উপস্থিত বাংলাদেশি প্রবাসীরা।এর আগের বছরও একইভাবে হারমোনিয়ামে সুর তোলে ‘ধনে ধান্য পুস্প ভরা আমাদের বসুন্ধরা’ গানটি গেয়ে আগত দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত। সুরে সুরে গত বছর দূতাবাসের উদ্যোগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম ও জাতীয় কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে কোরিয়ান শিল্পী লি ইয়াং সিকের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত দ্বৈতকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও’ গেয়ে দর্শকদের বিস্মিত করেন। সংস্কৃতির এই সেতুবন্ধনে বার বার কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ হন কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা এবং কোরিয়ান নাগরিকরা। তাছাড়া, মুজিবনগর দিবস ও জাতির জনকের জন্মবার্ষিকীতে গান গেয়ে তাক লাগান এই রাষ্ট্রদূত। নানান সময়ে দূতাবাসের অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বিনিময়ের আসা রাষ্ট্রদূতরাও বিস্মিত ও আবেগে আপ্লুত হন তাঁর সুরের মুর্ছনায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় ও বৈশাখের আনন্দ ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে যে অনন্য আয়োজনের নজির রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম করেছেন তা কোরিয়ার বুকে বাংলাদেশের এক প্রাণের গল্প। তানসেনের কথা কে না জানি আমরা। গান গেয়ে তিনি নাকি বৃষ্টি নামাতেন। সুরের টানে ও সুরের মধ্য দিয়ে পরওয়ারদেগারের সঙ্গে নিজের সম্পর্কসূত্র আবিস্কারের চেষ্টা করেছেন ছেউড়িয়ার লালন ফকির। একইভাবে কোরিয়ায় ভিনদেশি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষদেরকে সুরের মুর্ছনায় মোহিত করেন রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম নিজেই। একইভাবে সিউলে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরকে নানা অনুষ্ঠানে গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেন তিনি। সুরের মর্ছনায় আন্দোলিত ও আপ্লুত করার পাশাপাশি কূটনীতির বর্ণিল ম্যাপ তৈরি করেন তিনি। আবিদা ইসলাম সাংস্কৃতিক কূটনীতির যে ধারা সৃষ্টি করেছেন তা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
এই রাষ্ট্রদূতের মতে, সংগীত যেভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে অন্য কোন স্বর-শব্দই তা পারে না। এভাবেই বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে এবং লাল সবুজের বাংলাদেশকে নিজ কাঁধে ফেরি করছেন রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম।##১৫.১০.২০

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.