--- বিজ্ঞাপন ---

জাপানের সাবমেরিনের সাথে হংকং এর একটি জাহাজের সংঘর্ষ

0
প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের একটি সুরিউ ক্লাস ডিজেল ইলেকট্রিক স্টিলথ সাবমেরিনের সাথে হংকং ভিত্তিক একটি বানিজ্যিক জাহাজের সংঘর্ষ হয়। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি সোমবার এ ঘটনা ঘটে। সাবমেরিনটি সেই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে রুটিন মাফিক অপারেশনে নিয়োজিত ছিল। মুলত গত সোমবার মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিকোকু দ্বীপের কাছে এই সংঘর্ষ হয় এবং এই দূর্ঘটনায় সাবমেরিনে থাকা তিনজন ক্রু সামান্য আহত হয়েছেন।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, জাপানিজ ম্যারিটাইম সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সের সুরিউ ক্লাস স্টিলথ ফাস্ট এট্যাক সাবমেরিনটি সারফেসে ভেসে উঠার সময় জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এই সংঘর্ষে সাবমেরিনটির অ্যান্টেনা ও উপরের কিছু অংশ সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন সাবমেরিনটিকে জাপানের মূল সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে সাবমেরিনে বিশ্ব মানের উন্নত প্রযুক্তি ও রাডার সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও সাবমেরিনের কাছাকাছি সাগরের সারফেসে বিশাল আকারের বানিজ্যিক জাহাজের অবস্থান সনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে যাচ্ছে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। জাপানের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি কনভেনশনাল পাওয়ারড সুরিউ ক্লাস স্টিলথ এ্যাটাক সাবমেরিনের উৎপাদন মিতসুবিশি শিপইয়ার্ড ফ্যাসালিটিতে শুরু করা হয় ২০০৫ সালে এবং এটি প্রথম জাপানিজ মেরিটাইম সেলফ ডিফেন্স ফোর্সে সার্ভিসে আসে ২০০৯ সালে। ৬৫ জন ক্রু দ্বারা পরিচালিত এই সাবমেরিনের সারফেসে ওজন ২,৯০০ টন এবং সাবমার্জড অবস্থায় এর ওজন ৪,২০০ টন। বর্তমানে জাপানের মেরিটাইম সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্সের অধীনে এই জাতীয় মোট ১১টি সুরিউ ক্লাস ফাস্ট এ্যাটাক সাবমেরিন অপারেশনাল রয়েছে এবং ১টি নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। জাপানের মিতসুবিসি হেভী ইন্ডাস্ট্রিজ এবং কাওয়াসাকি যৌথভাবে ডিজাইন ও তৈরি করছে সুরিউ ক্লাস সাবমেরিনটি। আসলে ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯.১ মিটার বিম এবং ৮.৫ মিটার ড্রাউটের এই সাবমেরিনের অপারেশনাল ডাইভিং গভীরতা ২৫০ মিটার সর্বোচ্চ ডাইভিং গভীরতা ৫০০ মিার। তাছাড়া এটি একটানা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সাগরের বুকে নিরব ঘাতক হিসেবে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং এই দীর্ঘ সময়ে সাবমেরিনে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী লিথিয়াম আয়ন সুপার চার্জার ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। আর জাপান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই প্রযুক্তি বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে। এর সর্বোচ্চ রেঞ্জ ৬,১০০ নটিক্যাল মাইল এবং এটির সারফেসড গতি ১৩ কে-নট এবং সাবমার্জড অবস্থায় গতি ২০ কে-নট। সাবমেরিনে ডিজেল ইঞ্জিন হিসেবে ২টি কাওয়াসাকি ১২ভি ২৫/২৫ এসবি টাইপ ডিজেল ইঞ্জিন এবং ৪টি কাওয়াসাকি ককুয়ামস ভি-৪ ২৭৫ আর স্ট্রিলিং ইঞ্জিন ব্যবহার করে। যা সাওফেসে ২,৯০০ কিলোওয়াট এবং সাবমার্জড অবস্থায় ৬,০০০ কিলোওয়াট শক্তি উৎপন্ন করে। সুরিউ ক্লাস সাবমেরিনের অস্ত্র হিসেবে ৬টি এইচই-৬০৬ ৫৩৩ এমএম টর্পেডো টিউবে অটোমেটেড লোডিং সিস্টেমে টর্পেডো এবং মিসাইল ফায়ার করতে সক্ষম। বিশেষ করে ৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের টাইপ-৮৯ টর্পেডো এবং ১২৪ কিলোমিটার পাল্লার ইউজিএম-৮৪ হার্পুন এন্টিশীপ মিসাইল ব্যবহার করা হয় সাবমেরিনে। তাছাড়া সাবমেরিনে ৩০টি টর্পেডো র্যাকে সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং সাগরের বুকে শত্রু পক্ষের জাহাজ এবং সাবমেরিন ধ্বংস করার লক্ষ্যে মাইন স্থাপন করতে পারে সাবমেরিনটি। সাবমেরিনের সেন্সর এবং প্রোসেসিং সিস্টেম হিসেবে জেড-৬এফ সারফেস/ লো-লেভেল আইর সার্চিং রাডার, ওকেআই জেডকিউকিউ-৭ সোনার সুইট, ১টি বো-অ্যারে, ৪টি এলএফ ফ্ল্যাঙ্ক অ্যারে এবং ১টি টাউয়েড অ্যারের সোনার সিস্টেম ইনস্টল করা হয়েছে। তাছাড়া ইলেক্ট্রনিক্স ওয়ারফার এণ্ড ডিকয়েস সিস্টেম হিসেবে জেডএলআর-৩-৬ ইএসএম ইকুইপমেন্ট ইনস্টল করা হয়েছে। অ্যাকোস্টিক ডিভাইস কাউন্টারমেসারস (এডিসি) চালু করার জন্য ২টি ৩ ইঞ্চি আন্ডারওয়াটার ক্যালোমেজার লঞ্চার টিউব ইনস্টল করা হয়েছে। তবে এখানে প্রকাশ থাকে যে, জাপানিজ সুরিউ ক্লাস সাবমেরিনের আসল অস্ত্র কিন্তু এর স্টিলথ ক্যাপাবিলিটি। তাছাড়া এটি খুবই কম শব্দ উৎপন্ন করে সাগরের বুকে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘ দিন। তাই এটিকে এক কথায় ডিটেক্ট করা খুব কঠিন। জাপান কিন্তু সর্বদা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি সুরিউ ক্লাস সাবমেরিনের তথ্য খুবই গোপন রাখার চেষ্টা করে যায় এবং সাধারনত মিডিয়ার সামনে এই সাবমেরিন নিয়ে খুব একটা তথ্য প্রকাশ করে না। তবে মনে করা হয় এটা চীনের সমজাতীয় ডিজেল ইলেক্ট্রিক সাবমেরিন অপেক্ষা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। এর এয়ার ইন্ডিপেন্ডেট প্রপালশন সিস্টেমের সাহয্যে পানির নিচে টানা কয়েক সপ্তাহ দিনের কাছাকাছি লুকিয়ে থাকতে পারে। ইউকীপিডিয়ায় এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের অন্যতম সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের নৌবাহিনীতে মোট ৭৯টি সাবমেরিন দেখানো হলেও বর্তমানে ৬০-৬২টি সাবমেরিন অপারেশনাল থাকতে পারে এবং অতি পুরনো সাবমেরিনগুলো তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে চাইনিজ পিপলস লিবারেশন নেভির ৪টি নিউক ব্যালেস্টিক মিসাইল বহনে সক্ষম (এসএসবিএন) নিউক্লিয়ার পাওয়ারড স্ট্যাটিজিক সাবমেরিন, ৬টি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড এ্যাটাক সাবমেরিন (এসএসএন) এবং ৫০টি ডিজেল ইলেক্ট্রিক এ্যাটাক সাবমেরিন (এসএসকে) রয়েছে। তার বিপরীতে জাপানের সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের হাতে বর্তমানে সী-কিলার খ্যাত ২২টি ডিজেল ইলেক্ট্রিক পাওয়ারড ফাস্ট এ্যাটাক সাবমেরিন রয়েছে। আর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাপান তাদের সুরিউ ক্লাস সাবমেরিন সুপার চার্জার লিথিয়াম আয়ন ব্যাট্যারি ব্যবহার করে সাবমেরিন প্রযুক্তিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। তাছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাপানের সাবমেরিনগুলো এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে যে কোন দেশের জন্য ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে।

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.