--- বিজ্ঞাপন ---

গোয়েন্দা গিন্নী স্বগতা

করোনা বন্দীর রোজনামচা - ৩

0
রেফায়াত কবির শাওন, অতিথি লেখক##
গত শতাব্দির কথা। জিটিভিতে একটা সিরিয়াল দেখা শুরু করলাম, নিতান্ত বাংলায় গোয়েন্দা কাহিনী বলে। এখানে গোয়েন্দা একজন রিটায়ার্ড কর্ণেল। এত বছরে গোয়েন্দা প্রবর আমার স্মৃতিতে আবছা হয়ে গেলেও, তাঁর তরুনী সহকারী কিন্তু স্মৃতিতে একদম স্পস্ট।
স্মৃতির এই দোলচালের জন্য আশা করি আপনারা আমাকে আমার কবি, ছড়াকার বন্ধু Jahir Uddin এর মত ভুল বুঝবেন না। সেই ল্যান্ডফোনের যুগে এই খ্যাতিমান ছড়াকারের ফোন নম্বরও ছিল ছন্দে লেখা। ছয় ডিজিটের ফোন নম্বরে তিনটি ছয় নির্দিষ্ট বিরতিতে থেকে এক অসাধারণ ছন্দ। তো একদিন আমি এই ছন্দময় ফোন নম্বর ভুলে গিয়ে ওকে একটা জরুরি খবর দিতে পারলাম না। আর যায় কোথা, পরদিন সবার সামনে সে বলল আমার স্মৃতি লিঙ্গ নিরপেক্ষ নয়, সে পুরুষ মানুষ বলে তার ফোন নম্বর আমার মনে নাই, এক্ষেত্রে কোন সুন্দরী হলে শুধু ফোন নম্বর না, গাড়ীর নম্বর, এমনকি বাড়ির হোল্ডিং নম্বরও আমার মনে থাকত।
যাই হোক আপনারা নিশ্চয় জহিরের মত দুর্জন নন। কর্নেলের সহকারীর কথা এখনও আমার স্মৃতিতে অম্লান থাকার পেছনে নিশ্চয়ই কোন ভদ্র, বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা খুঁজে পাবেন। সিরিয়ালে কর্নেলের সহকারীর নাম ছিল স্বগতা আর এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সে সময় সল্প পরিচিত তরুনী অভিনেত্রী ইন্দ্রানী হালদার। বয়স্ক কর্নেলের তরুনী সহযোগী, এ নিয়ে একটা বাজে কেমিস্ট্রী ফাঁদার বদচিন্তা সে সময়ের পরিচালকদের আসত না। তাই ছিপছিপে গড়নের সুন্দরী স্বগতা সবার মন জয় করেছিল তাঁর অসাধারণ অভিনয় দিয়ে।
এই লকডাউনের কারণে প্রায় দুই দশক পর আবার মন খুলে টিভি দেখার সুযোগ হল। কর্নেলের সহযোগী স্বগতা এখন আরেকটি সিরিয়ালে নিজেই গোয়েন্দা। সেই দুই যুগ আগের ছিপছিপে ই্ন্দ্রানী হালদার এখন কিছুটা পৃথুলা – তাই বয়স আর ওজন বিবেচনায় তিনি গোয়েন্দা গিন্নী। আগ্রহ নিয়ে দেখতে বসলাম। ভয়াবহ অবস্থা! আধঘন্টার কাহিনিতে দশ মিনিট বিজ্ঞাপন। প্রতিটা বিজ্ঞাপন বিরতীর শুরুতে বিরতীর পর কি হবে তার ফিরিস্তি। আরে বাবা পাঁচ মিনিট পরতো পুরোটা দেখব। এখন কাটপিস মারার দরকারটা কি। যদিও সিরিয়ালটি সপ্তাহে পাঁচদিন দেখানো হয় তাও প্রতি পর্বের শুরুতে আগের দিন কি হয়েছিল তার লম্বা বয়ান।
এ যুগের টিভি দর্শকরা কি সব ডেমেনশিয়া আক্রান্ত নাকি? একদিন আগের কথাও বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়। আমাদের যুগে ‘এইসব দিনরাত্রি’ ‘বহুব্রীহি’ পনের দিন পরে দেখানো হত। আগের পর্বে কি হয়েছে আমাদের হুবহু মনে থাকত।
বুঝলাম ত্রিশ মিনিটের সিরিয়ালে দশ মিনিটের বেশি হজমযোগ্য জিনিস থাকবে না। কিন্তু তাতেও রক্ষে নেই। সেই যে কোন এককালে এইসব পরিচালক মুখে বারবার ফোকাস করে একটা টেন্স এনভারনমেন্ট ক্রিয়েট করার টেকনিক শিখেছিলেন এখনও তাতেই আছেন। কাহিনী যতই ভাল হোক, দুর্বল পরিচালনা আর অতি ব্যবসায়িক চিন্তা সব কিছুর বারটা বাজাচ্ছে।
কতক্ষণ আর এসব দেখা যায়। দেশের টিভি চ্যানেলগুলো তো টকশো চ্যানেল। যা কিছূ নাটক দেখানো হয় তা অতি দুর্বল। কেউ কেউ আবার প্রমিত ভাষা ছেড়ে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করে কিছু এক্সপেরিমেন্ট করছেন্। মার্ক টোয়েন, টনি মরিসন, ইউজিন ও নেইলের মত লেখকরা আঞ্চলিক ভাষাকে তাদের সাহিত্যকর্মে এনেছেন কোন জনপদের সংস্কৃতিকে তুলে আনার জন্য। তাঁদের লেখা থেকে কালজয়ী চলচিত্র হয়েছে। আর আমাদের তথাকথিত কিছু স্ক্রিপ্ট রাইটার পাড়ার রকে বসে বেকার যুবকদের শিষ দেয়াকে নাটকে এনে প্রমিত ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে চ্যালেন্জ ছুঁড়ছেন। এরা তো কমেডি আর ভাঁড়ামির পার্থক্যও বোঝে না। এদের হাতেই এখন আমাদের বাংলা নাটক। তাই ভারতের বাংলা চ্যানেলের মত দেশের বাংলা চ্যানেলেও আমার মত বেরসিক মানুষের জন্য দেখার কিছু নেই। কি আর করা সত্যজিত রায় – হুমায়ুন আহম্মদদের যুগেই থাকব আমি। ওইদিকে হলিউড বলিউড এগিয়ে যাচ্ছে। ভাল মানের হিন্দি ইংরেজি অনুষ্ঠানের অভাব নেই কোন।
অবশ্য একটি কথা না বললে নয়। সিরিয়ালের মান যেখানেই যাক হলিউডের ডেমি মুর, মেরিল স্ট্রীপ, জোডি ফস্টারের মত ছোট বেলায় দেখা সেই স্বগতা মানে ইন্দ্রানী হালদার এই বয়সেও অভিনয় করছেন অসাধারণ। তাছাড়া ইশ্বর প্রদত্ত সৌন্দর্য্ তো আছেই। অনেকে বলেন ইহুদি নারীরা সবচেয়ে সু্ন্দরী। তাঁদের দেখার সৌভাগ্য হয়নি তেমন। তারপর নাকি ককেশিয়রা। তা হতেই পারে, না হলে কি টলস্টয়, কাফকা, চেখভ এত ভাল সাহিত্য রচনার অনুপ্রেরণা পেতেন।। তবে যে যাই বলুক, সৌন্দর্যে  হোক আর প্রতিভায় হোক, প্রাচ্য অবশ্যই পাশ্চাত্য থেকে এগিয়ে।### ২৮.১০.২০

আপনার মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.